দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে শিশুরা থাকলে বিষয়টি কীভাবে ম্যানেজ করবেন?
দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে শিশুরা থাকলে বিষয়টি কীভাবে ম্যানেজ করবেন?

ভূমিকা
দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে শিশুরা থাকলে বিষয়টি কীভাবে ম্যানেজ করবেন?দ্বিতীয় বিয়ে আধুনিক সমাজে একটি সাধারণ বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া, সঙ্গীর মৃত্যু কিংবা অন্য কোনো কারণে দ্বিতীয় বিয়ের প্রয়োজন দেখা দিতে পারে। কিন্তু এই সিদ্ধান্তের সাথে জড়িয়ে থাকে একাধিক মানসিক, সামাজিক ও পারিবারিক চ্যালেঞ্জ। এর মধ্যে সবচেয়ে সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—দ্বিতীয় বিয়েতে যদি এক বা উভয় পক্ষের আগের সংসার থেকে সন্তান থাকে, তবে সেই সন্তানদের মানসিক ও পারিবারিক ভারসাম্য কীভাবে রক্ষা করা হবে।
এই লেখাটিতে আমরা বিশ্লেষণ করবো—
- কেন শিশুর বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা জরুরি?
- শিশুর মানসিকতা কীভাবে কাজ করে?
- শিশুর সঙ্গে নতুন সঙ্গীর সম্পর্ক গড়ে তোলার উপায়
- নতুন সংসারে সবার জন্য ভারসাম্য রক্ষার কৌশল
- সামাজিক চাপ ও পারিবারিক বাস্তবতা কীভাবে সামলাতে হয়
শিশুদের গুরুত্ব কেন?
একটি শিশুর জীবনে বাবা-মা তার পৃথিবী। তাই বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ বা একজন নতুন মানুষ পরিবারের অংশ হওয়া তার জন্য একটি বিশাল পরিবর্তন। এই পরিবর্তন যদি সঠিকভাবে পরিচালনা না করা হয়, তাহলে শিশুর মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এমনকি শিশুর আচরণ, আত্মবিশ্বাস, স্কুল পারফরম্যান্স, সামাজিক সম্পর্ক—সবকিছুতেই পরিবর্তন আসতে পারে।
তাই দ্বিতীয় বিয়ের আগে কিংবা পরে, শিশুর অনুভূতি, চিন্তা, ভয়, প্রত্যাশা—সবকিছু বুঝে আগানো দরকার।
শিশুর মানসিকতা: ভয়ের জায়গাগুলো কী?
দ্বিতীয় বিয়েতে শিশুর ভয়, অস্বস্তি, কিংবা বিরোধিতার পেছনে কিছু কারণ থাকতে পারে—
- স্থান হারানোর ভয়:
শিশুর মনে হতে পারে, নতুন মা বা বাবা এলে তার গুরুত্ব কমে যাবে। - বিশ্বাসঘাতকতার অনুভূতি:
বিশেষ করে যদি একজন পিতামাতাকে সে ভালোবাসে, তবে দ্বিতীয় বিয়েকে সে বিশ্বাসঘাতকতা ভাবতে পারে। - স্বত্ব হারানোর ভয়:
পরিবারে নতুন কেউ এলে নিজের জায়গা যেন ছোট হয়ে যাচ্ছে—এমন ভাবনা জন্ম নিতে পারে। - নতুন সম্পর্কে নিরাপত্তাহীনতা:
শিশুর মনে হয়, নতুন মানুষটা কি তাকে ভালোবাসবে? না কি শুধু তার বাবা/মাকে?
শিশুকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করার কৌশল
১. সময় দিন
বিয়ের সিদ্ধান্ত নিয়ে তাড়াহুড়ো করবেন না। শিশুর মানসিক প্রস্তুতির জন্য সময় দিন। তাকে ধীরে ধীরে বোঝান, সঙ্গীকে পরিচয় করিয়ে দিন।
২. খোলামেলা আলোচনা করুন
বয়স উপযোগী ভাষায় তাকে বলুন, আপনি কেন বিয়ে করছেন, নতুন মানুষটির ভূমিকা কী হবে, এবং শিশুর জীবনে কী পরিবর্তন আসতে পারে।
৩. শিশুকে গুরুত্ব দিন
তাকে জানিয়ে দিন—সে সব সময়ই আপনার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ থাকবে। নতুন সঙ্গী আসলেও তার অবস্থান বা গুরুত্ব কমবে না।
৪. নতুন সঙ্গীর সঙ্গে ধীরে ধীরে সম্পর্ক গড়তে দিন
জোর করে নয়, বরং ধীরে ধীরে তাদের একসাথে সময় কাটাতে দিন, যেন স্বাভাবিকভাবে একটি সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
নতুন সঙ্গীর ভূমিকা
১. সহানুভূতিশীল হোন
শিশুটি হয়তো শুরুতে আপনাকে গ্রহণ করবে না। এটা স্বাভাবিক। জোর করে নয়, ভালোবাসা, সম্মান ও সহানুভূতির মাধ্যমে তার পাশে থাকুন।
২. শিক্ষক বা অভিভাবকের মতো আচরণ নয়, বরং বন্ধু হোন
শিশুর প্রথম বিশ্বাস অর্জন করতে গেলে তাকে শাসন নয়, বন্ধুত্ব দরকার। শুরুর দিকে শুধু বন্ধুর ভূমিকাতেই থাকুন।
৩. আগের সম্পর্ককে সম্মান করুন
যদি শিশুটি তার মা/বাবার প্রতি সংবেদনশীল হয়, তাহলে কখনোই তাদের সম্পর্কে নেতিবাচক কিছু বলবেন না।
মিলিত পরিবারে (Blended Family) মানিয়ে নেওয়ার কৌশল
দ্বিতীয় বিয়ের মাধ্যমে দুটি পরিবার একত্রিত হলে তা একটি “Blended Family” তৈরি করে। এতে নতুন স্বামী/স্ত্রী, তাদের সন্তান এবং আগের পক্ষের সন্তান মিলিতভাবে বাস করে। এতে মানিয়ে চলার জন্য কিছু কৌশল দরকার—
১. পারস্পরিক সম্মান গড়ে তোলা
পরিবারে সবাই যেন একে অপরের মতামতকে সম্মান করে। শিশুরাও যাতে কথা বলতে পারে এমন পরিবেশ গড়ে তুলুন।
২. পারিবারিক সময় নির্ধারণ করুন
একসাথে খাওয়া, ঘুরতে যাওয়া, গেম খেলা, গল্প বলা—এসবের মাধ্যমে বন্ধন গড়ে তুলুন।
৩. ভিন্নমতকে শ্রদ্ধা করা শেখান
নতুন মা বা বাবাকে যদি শিশুরা প্রথমে মেনে না নেয়, তাদের স্বাধীনতা দিন। তাড়াহুড়ো করে মানাতে চেষ্টা করবেন না।
৪. নতুন নিয়ম তৈরি নয়, বরং ধীরে ধীরে রূপান্তর
একেবারে নতুন নিয়ম জারি না করে ধীরে ধীরে নতুন শৃঙ্খলা ও সংস্কৃতি গড়ে তুলুন।
শিশুর বয়স অনুযায়ী দৃষ্টিভঙ্গি
ছোট শিশু (৩–৭ বছর)
- বোঝার ক্ষমতা সীমিত, কিন্তু আবেগ প্রবল।
- তারা বিচ্ছেদকে নিজেদের দোষ ভাবতে পারে।
- নতুন ব্যক্তিকে “মা” বা “বাবা” হিসেবে মেনে নিতে কষ্ট হতে পারে।
পরামর্শ:
গল্প, কার্টুন, বা খেলনার মাধ্যমে সম্পর্ক তৈরি করুন। তার অনুভূতির গুরুত্ব দিন।
মাঝারি বয়সের শিশু (৮–১২ বছর)
- যুক্তি বুঝতে শুরু করে।
- নিজেদের মত প্রকাশ করে।
- মা/বাবার প্রতি প্রটেক্টিভ হয়ে ওঠে।
পরামর্শ:
ওদের মতামত জিজ্ঞেস করুন। গুরুত্ব দিন। খোলামেলা আলোচনা করুন।
কিশোর (১৩–১৮ বছর)
- স্বাধীনতা চায়।
- ব্যক্তিগত মতামতে দৃঢ় হয়।
- দ্বিতীয় বিয়ের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া আসতে পারে।
পরামর্শ:
তাদের সম্মান করুন। বন্ধুর মতো আচরণ করুন। কাউন্সেলিং লাগতে পারে।
দ্বৈত দায়িত্ব ও সময় ব্যবস্থাপনা
দ্বিতীয় বিয়েতে দু’পক্ষের সন্তান থাকলে আপনাকে ভারসাম্য রাখতে হবে—
- দুই পক্ষের সন্তানদের সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
- একে অপরের প্রতি ঈর্ষা যেন তৈরি না হয়।
- “আপনার সন্তান” এবং “আমার সন্তান” বিভাজন থেকে দূরে থাকতে হবে।
শিশুদের প্রতি আচরণে কিছু সতর্কতা
✅ করবেন:
- নিরপেক্ষ আচরণ
- শিশুর অনুভূতির মূল্যায়ন
- ধৈর্য ধরে তাদের পরিবর্তন মেনে নেওয়া
- তাদের সঙ্গে সময় কাটানো
❌ করবেন না:
- তুলনা করা (“তোমার আগের মা/বাবা এরকম করতেন”)
- জোর করে ভালোবাসা আদায় করতে চেষ্টা
- ওদের সিদ্ধান্তে চাপ প্রয়োগ
প্রয়োজনে কাউন্সেলিং গ্রহণ করুন
সব পরিস্থিতি একইভাবে সামলানো যায় না। অনেক সময় শিশুর মানসিক জটিলতা দেখা দিতে পারে। সেক্ষেত্রে শিশু কাউন্সেলিং বা পারিবারিক থেরাপির সাহায্য নিন। এতে শিশু তার মনের কথা খুলে বলার সুযোগ পায় এবং মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখে।
সমাজ ও আত্মীয়স্বজনদের আচরণ কীভাবে সামলাবেন?
দ্বিতীয় বিয়ে সমাজে এখনো কিছু ক্ষেত্রে ট্যাবু। তার উপর যদি সন্তান থাকে, তখন অনেক কথাবার্তা, কটাক্ষ, বা প্রশ্ন আসে। যেমন:
- “তোমার সন্তানকে রেখে আবার বিয়ে করলে?”
- “নতুন মা/বাবা কি শিশুর দায়িত্ব নেবে?”
- “সন্তান কি নতুন সম্পর্ক মেনে নেবে?”
করণীয়:
- সমাজকে বোঝাতে নয়, সন্তানকে বোঝাতে মনোযোগ দিন।
- আত্মবিশ্বাসের সাথে নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকুন।
- সন্তান ও নতুন সঙ্গীর মধ্যে বিশ্বাস তৈরিই সবচেয়ে বড় জবাব।
সন্তানের ভবিষ্যৎ ও নিরাপত্তা
বিয়ে মানেই শুধু মানসিক সম্পর্ক নয়, দায়িত্বের বিষয়ও জড়িত। সন্তানকে নিয়ে ভাবতে হবে তার—
- শিক্ষা
- আবেগিক নিরাপত্তা
- আইনি অধিকার
- সম্পত্তির বিষয়
দ্বিতীয় বিয়েতে সন্তানের উত্তরাধিকার বা ভবিষ্যৎ যেন কোনোভাবে হুমকির মুখে না পড়ে, তা নিশ্চিত করুন।
সফল মিলিত পরিবারের উদাহরণ
বাংলাদেশে বা বিশ্বে অনেক মিলিত পরিবার আছে যারা সফলভাবে শিশুদের নিয়ে সুখে সংসার করছে। তারা নিজেদের মতো করে সম্পর্ক গড়ে তুলেছে, পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে শিশুরাও নিরাপদ পরিবেশে বেড়ে উঠেছে।
উদাহরণস্বরূপ:
- বাবা ও সৎ মা মিলে সন্তানকে নিয়ে গ্রুপ ভ্যাকেশন করছে।
- মা ও নতুন সঙ্গী মিলে সন্তানদের জন্য আলাদা সময় রাখছেন।
- সবাই একসাথে জন্মদিন, উৎসব পালন করছে।
এসব ছোট ছোট পদক্ষেপ শিশুর মনে নতুন সম্পর্কের প্রতি বিশ্বাস তৈরি করে।
উপসংহার
দ্বিতীয় বিয়েতে সন্তানের বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। এটি শুধু নতুন দাম্পত্য নয়, বরং একটি সম্পূর্ণ পরিবার গড়ার প্রক্রিয়া। শিশুর মন, আবেগ, ভয়, প্রত্যাশা—সবকিছুকে গুরুত্ব দিয়ে ধীরে ধীরে এগোতে হয়।
নতুন সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজন:
- ধৈর্য
- সহানুভূতি
- খোলামেলা যোগাযোগ
- আন্তরিক ভালোবাসা
এই উপাদানগুলো থাকলে শুধু সম্পর্কই নয়, একটি নিরাপদ ও ভালোবাসায় ভরা পরিবার তৈরি সম্ভব।
দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে শিশুরা থাকলে বিষয়টি কীভাবে ম্যানেজ করবেন? (দ্বিতীয় অংশ)
বাস্তব কেস স্টাডি ও অভিজ্ঞতা
দ্বিতীয় বিয়েতে সন্তানের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা আমরা অনেক বাস্তব জীবনের গল্পে দেখতে পাই। এখানে কয়েকটি উদাহরণ তুলে ধরা হলো, যেগুলো পাঠকের উপলব্ধি বাড়াতে সাহায্য করবে।
কেস স্টাডি ১: সামিরার গল্প
সামিরা ৩৫ বছর বয়সে দ্বিতীয় বিয়ে করেন। তার প্রথম সংসারে ৭ বছরের একটি কন্যাসন্তান ছিল। নতুন স্বামী রাশেদ কখনো বিয়ে করেননি। শুরুতে সামিরার মেয়ে রাশেদকে একেবারেই মেনে নেয়নি। রাশেদ ধৈর্য ধরে ধীরে ধীরে মেয়েটির সঙ্গে সময় কাটাতে শুরু করেন—তার হোমওয়ার্কে সাহায্য করা, গল্প শোনা, পার্কে নিয়ে যাওয়া ইত্যাদি। প্রায় এক বছর পর মেয়েটি নিজেই তাকে “আব্বু” বলে ডাকা শুরু করে। আজ তারা একটি সুখী মিলিত পরিবার।
বিশ্লেষণ: সময়, ধৈর্য এবং সহানুভূতি থাকলে শিশুর মনের বন্ধন গড়া সম্ভব।
কেস স্টাডি ২: মিঠুন ও সাবিনার পরিবার
মিঠুন ও সাবিনা দু’জনেই আগের সংসার থেকে সন্তানসহ দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন। মিঠুনের ছেলে ও সাবিনার মেয়ের বয়স কাছাকাছি। প্রথমে তারা একে অপরকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখত। বাবা-মা বুঝতে পেরে তাদের একসঙ্গে খেলার সুযোগ করে দেন, একসাথে স্কুল প্রজেক্টে যুক্ত করেন, এবং পারিবারিক সময় দেন। দুই বছর পর, তারা প্রায় ভাই-বোনের মতো হয়ে যায়।
বিশ্লেষণ: সঠিক দিকনির্দেশনা ও পরিবেশ থাকলে মিলিত পরিবারের সন্তানরা একসাথে বেড়ে উঠতে পারে বন্ধুত্বপূর্ণভাবে।
ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি
বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামো ধর্মনির্ভর। তাই দ্বিতীয় বিয়েতে সন্তানের উপস্থিতি ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে কীভাবে দেখা হয়, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ।
ইসলাম ধর্মে:
- ইসলামে দ্বিতীয় বিয়ে অনুমোদিত, তবে সন্তানদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
- অভিভাবকত্ব ও তত্ত্বাবধান: সৎ সন্তানদের প্রতি ভালো ব্যবহার এবং ইনসাফ করার নির্দেশ রয়েছে।
- রাসুল (সাঃ) নিজেই সৎ পিতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তিনি অনেক অনাথ শিশুকে দায়িত্ব নিয়েছেন এবং ভালোবাসা দিয়েছেন।
হিন্দু ধর্মে:
- দ্বিতীয় বিয়ে কিছু ক্ষেত্রে জটিল হলেও সন্তানের প্রতি দায়িত্ব-কর্তব্যকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
- সৎ পিতামাতা যদি ন্যায্য আচরণ করেন এবং সন্তানের প্রতি প্রেম দেখান, সেটিকে পূণ্যকর্ম হিসেবে ধরা হয়।
উপসংহার: ধর্মীয়ভাবে শিশুদের প্রতি সুবিচার, স্নেহ ও দায়িত্বশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই দ্বিতীয় বিয়েতে নতুন সঙ্গীকেও এই মূল্যবোধে গড়ে তুলতে হবে।
আইনি দিক: দ্বিতীয় বিয়ে ও সন্তানের অধিকার
বাংলাদেশের পারিবারিক আইন অনুযায়ী—
১. সন্তানদের হেফাজত (custody)
- সাধারণত শিশু মায়ের অধীনে থাকে, তবে এটি পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিবর্তন হতে পারে।
- দ্বিতীয় বিয়ের পর, হেফাজতকারীর পরিবর্তন আইনত হতে পারে।
২. সৎ সন্তানের প্রতি দায়িত্ব
- আইন অনুযায়ী, সৎ মা বা বাবা বাধ্যতামূলক দায়িত্বে পড়েন না, কিন্তু যদি তারা সন্তানকে দত্তক নেন বা তার দেখাশোনা করেন, তবে আইনি জটিলতা দেখা দিতে পারে।
৩. সম্পত্তি ও উত্তরাধিকার
- সৎ সন্তান নিজের পিতামাতার সম্পত্তির উত্তরাধিকার পাবে, নতুন পিতামাতার নয়—যদি না দত্তক নেওয়া হয়।
সতর্কতা: দ্বিতীয় বিয়ের আগেই সন্তানের হেফাজত, সম্পত্তি এবং দায়িত্ব সংক্রান্ত বিষয়গুলো আইনজীবীর মাধ্যমে পরিষ্কার করে নেওয়া ভালো।

শিশুর শিক্ষা ও মানসিক বিকাশে প্রভাব
দ্বিতীয় বিয়ে একটি শিশুর জীবনে অনেক কিছুর পরিবর্তন আনতে পারে। বিশেষ করে তার শিক্ষা, সামাজিক সম্পর্ক ও আত্মবিশ্বাসের ওপর প্রভাব পড়ে।
নেতিবাচক প্রভাব:
- মনোযোগ কমে যেতে পারে
- স্কুলে পারফরম্যান্সে অবনতি
- বন্ধুদের সঙ্গে দূরত্ব সৃষ্টি
- রাগ, হতাশা, আবেগপ্রবণতা
ইতিবাচক প্রভাব (যদি সঠিকভাবে পরিচালনা করা হয়):
- নিরাপদ ও স্থিতিশীল পারিবারিক পরিবেশ
- দুইজন অভিভাবকের সাপোর্ট
- ভালোবাসা ও নিরাপত্তা বোধ
- সামাজিক যোগাযোগে আত্মবিশ্বাস
করণীয়: স্কুলের শিক্ষক ও কাউন্সেলরের সঙ্গে যোগাযোগ রাখুন। শিশুর আচরণে পরিবর্তন দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নিন।
মিলিত পরিবারে উদযাপন ও উৎসবের ভূমিকা
উৎসব ও পারিবারিক উদযাপন সম্পর্ক দৃঢ় করার অন্যতম মাধ্যম। দ্বিতীয় বিয়ের পর শিশুর সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত করতে এই সময়গুলোকে কাজে লাগানো যায়।
কীভাবে?
- ঈদ, পূজা, জন্মদিন, নতুন বছর—সব সময় একত্রে পালন করুন
- শিশুকে পরিকল্পনায় যুক্ত করুন
- ছোট উপহার, স্পেশাল খাবার দিন
- আগের পরিবারের ঐতিহ্যও কিছুটা ধরে রাখুন
এতে শিশুর মনে হয়, নতুন পরিবার তাকে গ্রহণ করেছে এবং তার ঐতিহ্যকে সম্মান করছে।
ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি মোকাবেলা
সব শিশু বা সম্পর্ক একইরকম নয়। অনেক সময় কিছু জটিল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। যেমন:
১. শিশু নতুন সঙ্গীর প্রতি চরম বিরোধিতা করছে
সমাধান:
- কাউন্সেলিং শুরু করুন
- তাকে একান্ত সময় দিন
- জোর নয়, বিকল্প দিয়ে সম্পর্ক গড়ার চেষ্টা করুন
২. নতুন সঙ্গী শিশুকে গ্রহণ করছে না
সমাধান:
- সততা ও খোলামেলা আলোচনা করুন
- সম্পর্ক তৈরি করতে সময় দিন
- প্রয়োজনে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করুন
৩. সন্তান ও সৎ সন্তানের মধ্যে দ্বন্দ্ব
সমাধান:
- আলাদা আলাদা সময় দিন
- পরিবারের নিয়ম তৈরি করুন
- উভয় পক্ষকে সমান ভালোবাসা দেখান
নতুন সঙ্গীর মানসিক প্রস্তুতি
দ্বিতীয় বিয়েতে শুধু সন্তানের প্রস্তুতি নয়, নতুন সঙ্গীকেও মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকতে হবে।
জিজ্ঞেস করুন:
- আপনি কি শিশুর দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত?
- আপনি কি সৎ পিতা/মাতার ভূমিকা পালন করতে পারবেন?
- আপনার মূল্যবোধ শিশু পালনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না?
যদি উত্তর ইতিবাচক না হয়, তবে সম্পর্ক আরও গভীর হওয়ার আগেই বিষয়টি নিয়ে ভাবা উচিত।
সৎ সন্তান এবং নিজের সন্তানের মাঝে ভারসাম্য
যদি একজনের আগের সংসারের সন্তান থাকে, অপর পক্ষের না থাকে বা পরবর্তীতে সন্তান হয়, তখন ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন হয়ে যায়।
কিছু কৌশল:
- সবার মধ্যে সমান গুরুত্ব ও ভালোবাসা বজায় রাখা
- বঞ্চনা যেন না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকা
- একে অপরকে ভাই-বোনের মতো মেনে নিতে উৎসাহ দেওয়া
- পারিবারিক সিদ্ধান্তে শিশুদের যুক্ত করা
সামাজিক সমালোচনা ও আত্মবিশ্বাস
দ্বিতীয় বিয়েতে সন্তান থাকলে সমাজে নানা প্রশ্ন ও মন্তব্য আসতে পারে। যেমন:
- “সৎ মা কি ভালো হবে?”
- “সন্তান মানুষ করতে পারবে তো?”
- “আগের সম্পর্ক নিয়ে ঝামেলা হবে না?”
এসব পরিস্থিতিতে:
- নিজের সিদ্ধান্তের উপর আত্মবিশ্বাস রাখুন
- আত্মীয়স্বজনের কটাক্ষে কান না দিয়ে বাস্তবতা দেখুন
- শিশুকে প্রটেকশন দিন—তা মানসিক হোক বা সামাজিক
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
শিশুর ভবিষ্যৎ চিন্তা করে কিছু বিষয় দ্বিতীয় বিয়ের সময় থেকেই ঠিক করে নেওয়া উচিত:
- শিক্ষার পরিকল্পনা
- স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও চিকিৎসা ব্যবস্থা
- আইনি উত্তরাধিকার
- পারিবারিক বন্ধন বজায় রাখতে দীর্ঘমেয়াদী কৌশল
- মানসিক সুস্থতার জন্য বছরে অন্তত ১ বার পারিবারিক থেরাপি বা রিফ্রেশার
উপসংহার
দ্বিতীয় বিয়েতে সন্তান থাকলে সেটি শুধু একটি ভালোবাসার সম্পর্ক নয়, বরং এক বিশাল দায়িত্ব। এটি একটি নতুন পরিবার গড়ে তোলার অভিযাত্রা। শিশুকে পাশে নিয়ে, তার অনুভূতিকে সম্মান করে, ধৈর্য ও ভালোবাসা দিয়ে সম্পর্ক গড়ে তুললে সফল মিলিত পরিবার গড়া সম্ভব।
স্মরণ রাখতে হবে:
- ভালোবাসা জোর করে চাপানো যায় না, তবে ধৈর্য ও যত্ন দিয়ে অর্জন করা যায়।
- সন্তান পরিবারের আয়না—তাকে যতটা সম্মান দেবেন, পরিবার ততটাই সুন্দর হবে।
আত্মীয়-পরিজনের ভূমিকা এবং শিশুর মানসিক পরিবেশ
দ্বিতীয় বিয়েতে শুধু স্বামী-স্ত্রী বা শিশু নয়, বরং আত্মীয়-পরিজনের আচরণ ও মনোভাবও শিশুর মানসিকতাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। অনেক সময় নিকট আত্মীয়রা—দাদী, চাচা, খালা, মামা ইত্যাদি—নতুন পরিবারের সদস্যকে সন্দেহের চোখে দেখেন। তারা শিশুকে বিভ্রান্তিকর কথা বলেন, যেমন:
- “তোমার নতুন মা তোমাকে ভালোবাসবে না।”
- “নতুন আব্বু তোমার জায়গা দখল করে নেবে।”
- “আগের পরিবারই ভালো ছিল।”
এই ধরনের মন্তব্য শিশুর মনে বিভ্রান্তি ও ভয় তৈরি করে। তাই আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে আগেই আলোচনা করে শিশুদের সামনে দায়িত্বশীল ভাষা ব্যবহার করতে বলা জরুরি।
কৌশল:
- পরিবারে সবাইকে বোঝান, এটি একটি সম্মিলিত পরিবর্তন।
- শিশুকে ছোটখাটো অভিযোগের বিষয়ে নিজেরাই পরিষ্কার ব্যাখ্যা দিন।
- যারা নেতিবাচক মন্তব্য করে, তাদের সঙ্গে শিশুর যোগাযোগ নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
দ্বিতীয় বিয়েতে গৃহপরিচারিকা ও শিক্ষকের ভূমিকা
অনেকেই খেয়াল করেন না, গৃহপরিচারিকা বা শিশুদের শিক্ষক/শিক্ষিকা অনেক সময় শিশুর মনোজগতে গভীর প্রভাব ফেলে। দ্বিতীয় বিয়ের পর, এই লোকগুলো যদি শিশুর প্রতি পক্ষপাতিত্ব করে বা নতুন সঙ্গীর বিরুদ্ধে কিছু বলে, তাহলে তা গভীর ক্ষতির কারণ হতে পারে।
করণীয়:
- শিক্ষকের সঙ্গে বৈঠক করে পরিবর্তিত পারিবারিক অবস্থা ব্যাখ্যা করুন।
- বাড়ির কাজের লোকদের শিশুর সামনে দায়িত্বশীল আচরণ শেখান।
- শিশুর স্কুল পারফরম্যান্স ও আচরণ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করুন।
শিশু যখন পিতা–মাতার মিলনের আশায় থাকে
অনেক শিশু তাদের মা-বাবার মধ্যে আবার মিলন ঘটবে বলে আশা করে। দ্বিতীয় বিয়ের খবর শুনলে তারা হতাশ হয়ে পড়ে। তখন তারা মনে করে:
- “আমার কারণে মা-বাবা এক হল না।”
- “আমার গুরুত্ব নেই কারো কাছে।”
ছোট ছোট উৎসব এবং “তোমার দিন” তৈরি করুন
দ্বিতীয় বিয়ের পরে অনেক শিশু মনে করে, সে এখন পরিবারের ‘প্রধান ব্যক্তি’ নয়। এই ভয় দূর করার জন্য এমন কিছু করতে পারেন:
১. শুধু শিশুর জন্য একটি দিন নির্ধারণ করুন
মাসে একদিন শুধু তার পছন্দের সব কাজ—যেমন সিনেমা দেখা, প্রিয় খাবার খাওয়া, তার সঙ্গে খেলা। একে বলা যেতে পারে “তোমার দিন”।
২. নতুন পারিবারিক রেওয়াজ তৈরি করুন
যেমন:
- প্রতিমাসে একবার “ফ্যামিলি পিকনিক”
- জন্মদিনে একসাথে কেক বানানো
- প্রতি শুক্রবার রাতে একসাথে সিনেমা দেখা
এই ধরনের ছোট ছোট রেওয়াজে শিশুরা নিরাপত্তা অনুভব করে এবং বুঝতে পারে—এই নতুন পরিবারটি তার জন্যই।
নতুন পরিবারে নিয়ম–কানুন তৈরি করার কৌশল
দ্বিতীয় বিয়ের পরে শিশুরা যদি অনুভব করে যে সব নিয়ম তাদের জন্য, আর নতুন সৎ ভাইবোন বা সঙ্গীর জন্য আলাদা নিয়ম, তাহলে তারা অসন্তুষ্ট হয়ে পড়ে।
সঠিক কৌশল:
- পরিবারের সবাই মিলে বসে নিয়ম তৈরি করুন
যেমন: কে কখন মোবাইল ব্যবহার করবে, পড়ার সময়, খেলাধুলা ইত্যাদি - সবাইকে সমানভাবে নিয়ম মানতে বাধ্য করুন
এতে শিশু বুঝবে সে অবহেলিত নয় - নতুন নিয়ম শুরুর আগে পুরনো নিয়মগুলোতে সম্মতি নিন
শিশুদের মতামতকে গুরুত্ব দিন

উপসংহার
দ্বিতীয় বিয়েতে শিশুর বিষয়টি যদি যথাযথ সম্মান, ভালোবাসা ও বুঝদারির মাধ্যমে পরিচালনা করা যায়, তাহলে সম্পর্ক শুধুই সার্থক হয় না—তা হয় অনেক বেশি শক্তিশালী ও সুন্দর।
নতুন পরিবার গড়ার এই পথে:
- শিশুর ভয়কে সম্মান করুন
- ভালোবাসা দিন, কিন্তু সময় নিয়ে
- নতুন সঙ্গীকে গড়তে সাহায্য করুন
- আত্মীয়স্বজনদের ইতিবাচক ভূমিকা নিশ্চিত করুন
- প্রযুক্তিকে শত্রু নয়, সহযোগী হিসেবে ব্যবহার করুন
এই ধাপে ধাপে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আপনি কেবল একটি নতুন সম্পর্কই নয়, বরং একটি নতুন জীবন গড়ে তুলতে পারবেন, যেখানে শিশু, আপনি ও আপনার নতুন সঙ্গী সবাই একসাথে নিরাপদ, আনন্দময় ও বন্ধনে পূর্ণ একটি পরিবারে বসবাস করতে পারবেন।
নতুন সন্তান জন্ম নিলে আগের সন্তানের মানসিকতা কীভাবে সামলাবেন?
দ্বিতীয় বিয়ের পর যদি নতুন সঙ্গীর সঙ্গে একটি সন্তান আসে, তখন আগের সংসারের শিশুর মনে হঠাৎ করে ‘প্রতিযোগিতা’ বা ‘বঞ্চনার’ ভয় কাজ করতে পারে। শিশুর মনে হতে পারে—নতুন শিশু আসায় তার প্রতি মা-বাবার মনোযোগ কমে গেছে। এটি মানসিকভাবে খুব সংবেদনশীল একটি সময়।
লক্ষণ:
-
শিশু হঠাৎ করে চুপচাপ হয়ে যায়
-
নতুন শিশুর প্রতি ঈর্ষা দেখায়
-
নিজের প্রয়োজনীয়তা বাড়িয়ে তোলে
-
অনর্থক জেদ করে বসে
করণীয়:
-
শিশুকে আগেই প্রস্তুত করুন:
গর্ভাবস্থার সময় থেকেই আগের সন্তানকে বলুন, “তুমি তো ভাই/বোন হবে। তোমার সাহায্য লাগবে ছোটটিকে দেখাশোনা করতে।” এতে দায়িত্ববোধ তৈরি হয়। -
বিশেষ সময় বরাদ্দ করুন:
নতুন সন্তান যতই ব্যস্ততা বাড়াক না কেন, প্রতিদিন অন্তত ২০-৩০ মিনিট সময় রাখুন শুধু আগের সন্তানের জন্য। সে যেন অনুভব করে—তার স্থান অটুট। -
তুলনা নয়, আলাদা আলাদা গুরুত্ব দিন:
শিশুরা তুলনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি খুব সহজে ধরে ফেলে। তাই একটির প্রশংসা করতে গিয়ে অন্যটিকে ছোট করবেন না। -
সহযোগিতা প্রশংসা করুন:
যদি বড় সন্তান নতুন শিশুকে কোলে নেয়, বোতল ধরে, বা খেলায় অংশ নেয়, তাহলে সেটির জন্য খোলা মনে বাহবা দিন।
এই ছোট ছোট পদক্ষেপই পারিবারিক শান্তি ও ভালোবাসা বজায় রাখতে সহায়ক হয়।