অনেক প্রোফাইল দেখার পর সিদ্ধান্তে আসা কঠিন হয় কেন?
অনেক প্রোফাইল দেখার পর সিদ্ধান্তে আসা কঠিন হয় কেন?

অনেক প্রোফাইল দেখার পর সিদ্ধান্তে আসা কঠিন হয় কেন? বর্তমান যুগে বিয়ে বা পার্টনার খোঁজার পদ্ধতি বদলে গেছে। আগে যেখানে পরিচিত আত্মীয়-স্বজন বা পাত্র-পাত্রীর পরিবারকেই নির্ভর করতে হতো, এখন সেখানে প্রযুক্তি এসে অনেকটাই জায়গা দখল করে নিয়েছে। অনলাইন ম্যারেজ মিডিয়া, ম্যাট্রিমোনিয়াল ওয়েবসাইট, ফেসবুক পেজ, এমনকি মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে শত শত প্রোফাইল হাতের মুঠোয় চলে আসে। কিন্তু এত সহজলভ্যতা সত্ত্বেও, সিদ্ধান্তে আসা অনেক সময় আরও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। অনেকেই বলেন—”এত প্রোফাইল দেখার পর মাথা ঘুরে যায়!” এই লেখায় আমরা বিশ্লেষণ করব কেন অনেক প্রোফাইল দেখার পরেও একজন মানুষ সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না, এবং এই জটিলতা থেকে কীভাবে বেরিয়ে আসা সম্ভব।
অধ্যায় ১: পছন্দের অতিভার – Decision Fatigue
১.১ সিদ্ধান্ত ক্লান্তি (Decision Fatigue) কী?
যখন একজন মানুষ বারবার সিদ্ধান্ত নিতে হয়, তখন এক ধরনের মানসিক ক্লান্তি তৈরি হয় যাকে বলে “সিদ্ধান্ত ক্লান্তি” বা Decision Fatigue। যত বেশি অপশন দেখা হয়, ততই মনে হয় “আরেকটু দেখি”, “এইটা ভালো কিন্তু আরও ভালো কিছু হয়তো আছে”, ইত্যাদি।
১.২ বিকল্প যত বাড়ে, মানসিক বিভ্রান্তিও বাড়ে
একজন ব্যবহারকারী যখন প্রতিদিন ৩০-৫০টা বা তার চেয়েও বেশি প্রোফাইল দেখেন, তখন মনের মধ্যে একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ চলতে থাকে। প্রতিটা প্রোফাইলের ছবি, পেশা, উচ্চতা, ধর্মীয় অনুশীলন, পরিবার, শিক্ষা—সবই বিচার করতে গিয়ে মন একসময় সিদ্ধান্তহীনতায় ডুবে যায়।
অধ্যায় ২: ‘পারফেক্ট’ এর পিছনে দৌড়
২.১ আদর্শ সঙ্গীর খোঁজে অতিরিক্ত প্রত্যাশা
অনেকেই মনে করেন, যেহেতু প্রোফাইলের অভাব নেই, তাই অপেক্ষা করলেই সবচেয়ে উপযুক্ত কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবে। ফলে প্রত্যেকটা প্রোফাইলেই খুঁত খোঁজা শুরু হয়।
২.২ ‘বেটার অপশন’ ফেনোমেনন
এই সমস্যা অনেকটা “Netflix Paradox” এর মতো। আপনি একটা সিনেমা দেখতে চান, কিন্তু এত বেশি সিনেমা দেখে ফেলেন যে শেষে কিছুই দেখা হয় না। অনলাইন প্রোফাইল দেখার ক্ষেত্রেও তাই হয়। আপনি ভাবেন, “এইটা ভালো, কিন্তু এরপরটা হয়তো আরও ভালো হবে।”
অধ্যায় ৩: তথ্যের অতিরিক্ততা (Information Overload)
৩.১ অনেক তথ্য মানেই ভালো সিদ্ধান্ত নয়
প্রোফাইলগুলোতে নাম, বয়স, উচ্চতা, পেশা, শিক্ষা, ছবি, ধর্মীয় মানসিকতা, পরিবারের বর্ণনা, এমনকি শখ-আহ্লাদও লেখা থাকে। যখন ৫০টা প্রোফাইল একই সাথে এসব তথ্য নিয়ে আসে, তখন সবগুলো একে অপরের সঙ্গে গুলিয়ে যায়।
৩.২ প্রোফাইলের তথ্য সবসময় বাস্তব নয়
অনেক সময় প্রোফাইলে দেওয়া তথ্য বা ছবি বাস্তবের সঙ্গে মেলে না। কেউ নিজের উচ্চতা বাড়িয়ে লেখেন, কেউ নিজের বেতন বা জব পজিশন একটু ‘পলিশ’ করে দেন। এতে করে একজন সঠিক বিচার করতে আরও বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন।
অধ্যায় ৪: মনস্তাত্ত্বিক চাপ
৪.১ সঠিক সিদ্ধান্ত না নেওয়ার ভয়
অনেকেই ভয় পান—“এই প্রোফাইলটা মিস করলে হয়তো জীবনের সেরা মানুষটাকে হারাবো।” আবার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললে ভাবেন—“আরও একটু সময় নিলে হয়তো আরও ভালো কাউকে পেতাম।” এই দোটানায় ভুগতে থাকলে সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়।
৪.২ পারিবারিক ও সামাজিক চাপ
অনেক সময় পরিবারের প্রত্যাশা ও নিজের ইচ্ছার মাঝে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। আপনি হয়তো একজনকে পছন্দ করছেন, কিন্তু পরিবারের চাহিদার সঙ্গে মেলে না। এই দ্বন্দ্বও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে বাধা দেয়।
অধ্যায় ৫: সম্পর্ক মানেই শুধু তথ্য নয়, অনুভবও
৫.১ আবেগের সংযোগ তৈরি না হওয়া
অনলাইন প্রোফাইল দেখলে কেবল তথ্য পাওয়া যায়, কিন্তু অনুভব বা ইমোশনাল কানেকশন তৈরি হয় না। কেউ কেউ একে পণ্য নির্বাচনের মতো ভাবেন—যা সম্পর্কের সত্যিকারের গভীরতা আনার পথে বাধা।
৫.২ মুখোমুখি দেখা বা কথা না বললে সম্পূর্ণ চিত্র বোঝা যায় না
অনেকেই কেবল প্রোফাইল দেখে বা একটি দুটি মেসেজে সিদ্ধান্ত নিতে চান না। আবার যাদের সঙ্গে কথা বলা হয়, তাদের মধ্যে কার সঙ্গে ভাল সংযোগ হবে তা বোঝা সময়সাপেক্ষ।
অধ্যায় ৬: প্রতিনিয়ত তুলনা করার অভ্যাস
৬.১ A বনাম B বনাম C
যত বেশি প্রোফাইল দেখা হয়, তত বেশি তুলনা হয়। একজনের চাকরি ভালো, আরেকজন দেখতে সুন্দর, আরেকজন পারিবারিকভাবে সচ্ছল। কে সেরা—তা বুঝে উঠতে পারা কঠিন হয়ে পড়ে।
৬.২ ‘সব পাওয়া চাই’ মানসিকতা
আমরা আজকের যুগে এমন এক সমাজে বাস করি যেখানে মনে করি “সেরা জিনিসটাই পাওয়া উচিত”—এমনকি সম্পর্কে। কিন্তু বাস্তবে, কেউই ১০০% পারফেক্ট হয় না।
অধ্যায় ৭: সিদ্ধান্তহীনতার পিছনে সামাজিক মাধ্যমের প্রভাব
৭.১ সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘আইডিয়াল কাপল’ ইমেজ
সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিদিন আমরা আদর্শ সম্পর্কের ছবি দেখি। এতে নিজের জন্যও এমন কিছু চাই বলেই মনে হয়। ফলে বাস্তব জীবনের মানুষগুলো সেই “ফিল্টার করা সম্পর্ক” এর সঙ্গে তুলনায় পড়ে।
৭.২ অতীত অভিজ্ঞতা এবং ভয়
আগে কেউ সম্পর্ক গড়ে ব্যর্থ হয়েছেন? তাহলে প্রোফাইল দেখে দেখা যায়—মনে ভয় ঢুকে যায়, “আবার যদি ভুল হয়?”
অধ্যায় ৮: সমস্যা সমাধানে করণীয়
৮.১ পছন্দের ক্ষেত্রে সীমা নির্ধারণ
একসাথে ১০০ প্রোফাইল না দেখে, প্রতিদিন সর্বোচ্চ ১০টি প্রোফাইল দেখা এবং প্রতি সপ্তাহে ২-৩ জনের সঙ্গে আলাপ করার নিয়ম চালু করুন।
৮.২ পছন্দের তালিকা (Priority Criteria) ঠিক করুন
আপনার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নির্ধারণ করুন—যেমন ধর্মীয় অনুশীলন, পারিবারিক মূল্যবোধ, শিক্ষাগত যোগ্যতা বা জীবনযাত্রার ধরণ। তারপর সে অনুযায়ী সংক্ষিপ্ত তালিকা করুন।
৮.৩ অভিভাবক বা পরামর্শদাতার সহায়তা নিন
নিজের একার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বেরিয়ে এসে বাবা-মা বা ঘনিষ্ঠ কাউকে সাথে নিয়ে প্রোফাইল দেখলে অনেক সময় স্পষ্টভাবে বোঝা যায় কে উপযুক্ত।
৮.৪ অনলাইন কথা বলার পর বাস্তবে দেখা
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সরাসরি দেখা ও আলোচনা করুন। সামনাসামনি সাক্ষাৎ অনেক ভুল ধারণা দূর করে দেয়।
অধ্যায় ৯: আত্মবিশ্বাস ও ধৈর্য গড়ে তুলুন
৯.১ সিদ্ধান্ত নিতে সময় নিন, কিন্তু অতিরিক্ত না
প্রতিটি প্রোফাইল দেখে “না” বলার আগে নিজেকে জিজ্ঞেস করুন—এই “না” কি যৌক্তিক কারণেই বলছি, না কি আমি কেবল আরেকজনের অপেক্ষায় আছি?
৯.২ নিজের অনুভূতিকে গুরুত্ব দিন
সব তথ্য যাচাইয়ের পরেও, যদি আপনার মনে হয় এই মানুষটির সঙ্গে সংযোগ হতে পারে—তবে তাকে সময় দিন, সম্পর্ক গড়তে দিন। কারণ সত্যিকারের সম্পর্ক গড়ে ওঠে সময়ের মধ্য দিয়েই।
অধ্যায় ১০: বাস্তব অভিজ্ঞতা – ব্যবহারকারীর চোখে সিদ্ধান্তহীনতা
অনলাইন ম্যারেজ মিডিয়া ব্যবহারকারীদের অভিজ্ঞতা থেকে জানা যায় যে, প্রথমদিকে প্রোফাইল দেখা একটি রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা হলেও কিছুদিনের মধ্যেই তা হতাশায় রূপ নেয়। নিচে কয়েকটি বাস্তব অভিজ্ঞতার চিত্র তুলে ধরা হলো—
১০.১ রাহাতের গল্প
রাহাত একজন আইটি প্রফেশনাল। বিয়ের জন্য সে এক জনপ্রিয় অনলাইন ম্যারেজ মিডিয়াতে প্রোফাইল খুলেছিল। প্রথম ২ মাসে সে প্রায় ৩০০টি প্রোফাইল দেখেছে এবং ৫০ জনকে মেসেজ দিয়েছে। কিন্তু সে এখনও কাউকে “হ্যাঁ” বলতে পারেনি। কারণ, তার মতে, “প্রতিটা প্রোফাইলে কিছু ভালো আছে, আবার কিছু না-পসন্দ। মনে হয়, আরেকটু দেখলেই হয়তো পারফেক্ট কাউকে পাবো।”
এই ধরনের মানসিকতা একদিকে সময় নষ্ট করে, অন্যদিকে মানসিক চাপ তৈরি করে। অনেক সময় ব্যবহারকারীরা ক্লান্ত হয়ে চেষ্টা বন্ধও করে দেন।
১০.২ শারমিনের অভিজ্ঞতা
শারমিন একজন স্কুল শিক্ষিকা। তিনি বলেন, “প্রোফাইলগুলো এত একরকম লাগে যে অনেক সময় কারটা কাকে দেখেছি, সেটা মনে থাকে না। কেউ কেউ তো একই ছবির ভিন্ন ভিন্ন প্রোফাইলে আছেন!”
এখানেও বোঝা যায়—তথ্য ও প্রোফাইলের গুণগত মান যতদিন পর্যন্ত উন্নত না হয়, ততদিন ব্যবহারকারী সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধায় থাকবেন।
অধ্যায় ১১: সিদ্ধান্তহীনতার প্রভাব – সম্পর্ক এবং আত্মবিশ্বাস
অনেক প্রোফাইল দেখে সিদ্ধান্তে না আসার বিষয়টি কেবল একক সমস্যা নয়; এটি একজন মানুষের আত্মবিশ্বাস, পারিবারিক চাপ এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্ক গঠনের উপরও প্রভাব ফেলে।
১১.১ আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরে
প্রতিবার কোনো প্রোফাইল বাদ দেওয়ার পর মনে হয়, “আমি কি ভুল করলাম?”, “আমি কি আদৌ জানি আমি কী চাই?”, “কেউ কি আমাকে পছন্দ করবে?”—এই চিন্তাগুলো একসময় আত্মবিশ্বাসকে খুঁইয়ে ফেলে।
১১.২ পরিবার হতাশ হয়ে পড়ে
বিশেষ করে মেয়েদের ক্ষেত্রে পরিবারের পক্ষ থেকে অনেক সময় বলা হয়—”তুমি এত খুঁতখুঁতে হলে চলবে না”, বা ছেলেদের বলা হয়—”তোমার বয়স তো বাড়ছে, এখনো ঠিক করতে পারছো না কেন?”
এই পারিপার্শ্বিক চাপ মানসিক অস্বস্তি তৈরি করে, এবং পাত্র-পাত্রীর মাঝে আত্মবিশ্বাসের সংকট তৈরি করে।
অধ্যায় ১২: কৃত্রিমতা বনাম বাস্তবতা
অনেক সময় প্রোফাইলগুলো এত বেশি সাজানো-গোছানো হয় যে, সেগুলো বাস্তব জীবনের সঙ্গে মেলে না। এটি একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়।
১২.১ অতিরঞ্জিত প্রোফাইল
- নিজের ছবি ১০ বছর আগের
- চাকরির বর্ণনা বাস্তবের চেয়ে উজ্জ্বল
- ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবে না থাকলেও প্রোফাইলে “ধার্মিক” লেখা
যখন ব্যবহারকারীরা এসব বিষয় ধরতে পারেন, তখন ভবিষ্যতের প্রতিটি প্রোফাইল নিয়েই সন্দেহ বাড়তে থাকে।
১২.২ সঠিক তথ্য না জানায় সিদ্ধান্তে বাধা
যখন ব্যবহারকারীরা মনে করেন যে প্রতিটি প্রোফাইল হয়তো মিথ্যা বা অতিরঞ্জিত, তখন তারা আর কাউকে বিশ্বাস করতে পারেন না। ফলে প্রোফাইল দেখা মানেই হয় ‘আস্থাহীনতা’।
অধ্যায় ১৩: প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার ও ফিল্টারিং
বর্তমান অনলাইন ম্যারেজ মিডিয়াগুলোতে একাধিক ফিল্টার ও অ্যালগরিদম ব্যবহার করা যায়। কিন্তু অনেকেই তা জানেন না বা ব্যবহার করেন না।
১৩.১ আপনার পছন্দ অনুযায়ী ফিল্টার করুন
যেমন—
- বয়স সীমা নির্ধারণ (যেমন ২৬-৩২)
- শিক্ষাগত যোগ্যতা (ব্যাচেলর, মাস্টার্স)
- ধর্মীয় মূল্যবোধ (নামাজি, পর্দানশীল ইত্যাদি)
- পেশা (সরকারি, প্রাইভেট, ফ্রিল্যান্সার)
এই ফিল্টার ব্যবহার করলে অপ্রাসঙ্গিক প্রোফাইল বাদ যাবে, এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ হবে।

প্রোফাইল একবারে নির্বাচন করতে না পারলে, ‘শর্টলিস্ট’ করে রাখুন। তারপর এক সপ্তাহ পরে আবার দেখুন। দ্বিতীয়বারে দেখলে হয়তো বুঝতে পারবেন কে আপনাকে বেশি টানে।
অধ্যায় ১৪: সময় ও মানসিক স্থিতিশীলতা – দুটোই জরুরি
১৪.১ প্রতিদিন নির্ধারিত সময়
প্রতিদিন নির্ধারিত সময় ব্যয় করুন প্রোফাইল দেখার জন্য—যেমন মাত্র ৩০ মিনিট। দিনভর এই কাজ করলে মানসিক চাপ বাড়ে।
১৪.২ একা নয়, পরিবারকে যুক্ত করুন
কিছু নির্ভরযোগ্য মানুষকে যুক্ত করুন। তারা নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে দেখে আপনার জন্য কিছু প্রোফাইল বেছে দিতে পারেন। এতে সময় ও মানসিক শক্তি—দুটোই সাশ্রয় হবে।
অধ্যায় ১৫: সম্পর্ক গড়ার মনোভাবের অভাব
১৫.১ সম্পর্ক গড়ার আগে মানসিক প্রস্তুতি প্রয়োজন
অনেক সময় মানুষ ভাবেন, “আসলে আমি এখনই বিয়ে করতে চাই না, কিন্তু দেখে রাখি।” এই মনোভাব প্রোফাইল দেখা মানুষটির প্রতি সুবিচার করে না।
১৫.২ ‘দেখি না, যদি ভালো লাগে‘ টাইপ মনোভাব পরিহার করুন
একজন মানুষকে বিবেচনায় নিলে তাকে সম্মান দিন। তাকে শুধু স্ক্রল করে ছেড়ে না দিয়ে, মন দিয়ে জানার চেষ্টা করুন। তাহলেই সম্পর্ক গড়ার পথ খুলবে।
অধ্যায় ১৬: আপনি কীভাবে নিজেকে প্রস্তুত করতে পারেন?
১৬.১ নিজের চাহিদা আগে পরিষ্কার করুন
নিজের মধ্যে নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর দিন:
- আমি কোন ধরনের পরিবার চাই?
- আমার জীবনের মূল্যবোধ কী?
- পার্টনারের কোন বিষয়গুলো আমার কাছে অগ্রাধিকার?
১৬.২ “পারফেক্ট” নয়, “সার্বিকভাবে মানানসই” খুঁজুন
পারফেক্ট মানুষ নেই। কিন্তু একজন হতে পারেন, যার সঙ্গে জীবনটা সহজ, স্বস্তির, ও পরস্পরের শ্রদ্ধাভিত্তিক হয়।
অনেক প্রোফাইল দেখা মানেই সিদ্ধান্তহীনতা নয়—যদি সঠিক পদ্ধতিতে দেখা হয়। আমাদের সমাজে সম্পর্ক গড়ার বিষয়টি যত সহজ ভাবা হয়, বাস্তবে তা ততটাই জটিল। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এই সিদ্ধান্তকে সহজ করতে পারে, যদি আপনি নিজের ভেতর দৃষ্টিভঙ্গি পরিষ্কার করে, সংযমী, চিন্তাশীলভাবে এগিয়ে যান।
স্মরণে রাখুন—প্রোফাইল যতই দেখুন না কেন, একজন মানুষকেই তো জীবনসঙ্গী হিসেবে নিতে হবে। তাই পরিমিতভাবে দেখা, আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেওয়া, এবং আবেগ ও বাস্তবতার সমন্বয় করাই হলো মূল চাবিকাঠি।
উপসংহার
অনেক প্রোফাইল দেখার পর সিদ্ধান্তে আসা কঠিন হয়—এটা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। কিন্তু এই জটিলতা থেকে বেরিয়ে আসার পথও আছে। মূল কথা হলো, নিজেকে জানুন, আপনার চাহিদা নির্ধারণ করুন, পরিমিতি বোধ রাখুন, এবং সঠিক দৃষ্টিভঙ্গিতে পাত্র বা পাত্রী নির্বাচন করুন।
এটি কোনো পণ্যের নির্বাচন নয়, বরং একটি জীবনের সিদ্ধান্ত—যেখানে তাড়াহুড়ো বা অতিরিক্ত খুঁতখুঁতানি—দুটিই পরিহারযোগ্য। স্থিরভাবে, আত্মবিশ্বাস নিয়ে সিদ্ধান্ত নিলে, অনেক প্রোফাইলের ভিড়ের মাঝেও আপনি খুঁজে পাবেন সেই বিশেষ মানুষটিকে—যার সঙ্গে জীবনটা হয়ে উঠবে পূর্ণতা ও ভালোবাসায় ভরপুর।
অনেক প্রোফাইল দেখার পর সিদ্ধান্তে আসা কঠিন হয় কেন?
অনলাইন ডেটিং প্ল্যাটফর্মগুলো, সোশ্যাল মিডিয়া, কিংবা পেশাগত নেটওয়ার্কিং সাইট – যেখানেই আমরা প্রোফাইল দেখি না কেন, একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক প্রোফাইল দেখার পর সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়াটা বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। এই সমস্যাটিকে ইংরেজিতে বলা হয় “Paradox of Choice” বা “Choice Overload”। অর্থাৎ, যখন আমাদের সামনে অনেকগুলো বিকল্প উপস্থিত থাকে, তখন সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া সহজ হওয়ার বদলে আরও জটিল হয়ে ওঠে। এর পেছনে বেশ কিছু মনস্তাত্ত্বিক এবং ব্যবহারিক কারণ কাজ করে।
প্রথমত, তথ্য আধিক্য (Information Overload) একটি প্রধান কারণ। যখন আমরা অসংখ্য প্রোফাইল দেখি, প্রতিটি প্রোফাইলে থাকে নিজস্ব তথ্য, ছবি, আগ্রহ, লক্ষ্য এবং বর্ণনা। এই বিপুল পরিমাণ তথ্য আমাদের মস্তিষ্কের উপর একটি বোঝা তৈরি করে। মস্তিষ্ক একবারে সীমিত সংখ্যক তথ্য প্রক্রিয়া করতে সক্ষম। যখন এই সীমা অতিক্রম করে যায়, তখন আমরা অভিভূত বোধ করি এবং প্রতিটি প্রোফাইলে থাকা গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলি সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করতে ব্যর্থ হই। যেমন, ডেটিং অ্যাপে আপনি হয়তো কয়েক ডজন প্রোফাইল স্ক্রল করে যাচ্ছেন, যেখানে প্রত্যেকের পছন্দ, অপছন্দ, পেশা, শিক্ষাগত যোগ্যতা ইত্যাদি ভিন্ন ভিন্ন। এত তথ্য একসঙ্গে প্রক্রিয়া করতে গিয়ে সব জট পাকিয়ে যায় এবং কোনো একটি নির্দিষ্ট প্রোফাইলের বৈশিষ্ট্য মনে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
দ্বিতীয়ত, তুলনা করার ক্লান্তি (Comparison Fatigue)। অসংখ্য প্রোফাইল দেখার অর্থ হলো প্রতিটি প্রোফাইলকে একে অপরের সাথে তুলনা করা। “এই প্রোফাইলটি কি ঐ প্রোফাইলের চেয়ে ভালো? এর আগ্রহগুলো কি ওর চেয়ে বেশি আকর্ষণীয়?” এই ধরনের ক্রমাগত তুলনা আমাদের মানসিক শক্তিকে নিঃশেষ করে দেয়। আমরা প্রতিটি প্রোফাইলের ছোট ছোট ত্রুটি বা অপূর্ণতা খুঁজে বের করতে থাকি এবং এতে করে কোনো একটি প্রোফাইলকে “পরিপূর্ণ” মনে হয় না। এই ক্লান্তি আমাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। আমরা এমনভাবে প্রতিটি প্রোফাইলকে বিশ্লেষণ করি যেন আমরা একটি পারফেক্ট মানুষকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি, যা বাস্তবসম্মত নয়।
তৃতীয়ত, “আরও ভালো কিছু পাওয়ার আশা” (Fear of Missing Out – FOMO)। এটি একটি অত্যন্ত শক্তিশালী মনস্তাত্ত্বিক কারণ। যখন আমাদের সামনে অনেক বিকল্প থাকে, তখন আমরা মনে করি যে হয়তো এর চেয়েও ভালো কোনো বিকল্প একটু পরেই আসবে। এই মানসিকতা আমাদের বর্তমান উপলব্ধ বিকল্পগুলোকে গুরুত্ব সহকারে দেখতে বাধা দেয়। আমরা একটি প্রোফাইলে মুগ্ধ হলেও, মনের মধ্যে একটি সংশয় কাজ করে যে, “আচ্ছা, আর দু’টো প্রোফাইল দেখলেই কি এর চেয়েও ভালো কাউকে পাবো?” এই FOMO আমাদের কোনো একটি নির্দিষ্ট প্রোফাইলে স্থির হতে দেয় না এবং আমরা ক্রমাগত নতুন প্রোফাইল খুঁজতে থাকি, যা একটি অন্তহীন চক্রে পরিণত হয়।
চতুর্থত, সিদ্ধান্ত গ্রহণের অক্ষমতা (Decision Paralysis)। যখন পছন্দের সংখ্যা অনেক বেশি হয়, তখন আমরা সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগি। এই অবস্থাকে “এনালাইসিস প্যারালাইসিস”ও বলা হয়, যেখানে অতিরিক্ত বিশ্লেষণ করতে গিয়ে আমরা কোনো সিদ্ধান্তেই পৌঁছাতে পারি না। প্রতিটি বিকল্পের খুঁটিনাটি যাচাই করতে গিয়ে সময় নষ্ট হয় এবং শেষ পর্যন্ত আমরা ক্লান্ত হয়ে কোনো সিদ্ধান্তই নিতে পারি না। যেমন, পেশাগত নেটওয়ার্কিং সাইটে একটি নির্দিষ্ট পদের জন্য অনেক প্রার্থীর প্রোফাইল দেখতে গিয়ে আপনি হয়তো কাউকেই চূড়ান্তভাবে বেছে নিতে পারছেন না, কারণ প্রত্যেকের মধ্যেই কিছু না কিছু ভালো বা মন্দ দিক খুঁজে পাচ্ছেন।
পঞ্চমত, অবাস্তব প্রত্যাশা (Unrealistic Expectations)। অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলো অনেক সময় আমাদের মধ্যে অবাস্তব প্রত্যাশার জন্ম দেয়। আমরা মনে করি যে, যেহেতু আমাদের সামনে হাজার হাজার প্রোফাইল রয়েছে, তাই “পারফেক্ট ম্যাচ” খুঁজে পাওয়া সম্ভব। এই প্রত্যাশা আমাদের মধ্যে ত্রুটিহীনতা খোঁজার প্রবণতা বাড়িয়ে তোলে। সামান্যতম অপূর্ণতা দেখলেই আমরা সেই প্রোফাইলটি বাতিল করে দেই, কারণ আমরা বিশ্বাস করি যে, আরও ভালো কিছু পাওয়া সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে, কোনো মানুষই সম্পূর্ণ ত্রুটিহীন হয় না।

ষষ্ঠত, নির্বাচনী চাপ (Pressure of Choice)। যখন আপনি অনেকগুলো প্রোফাইল থেকে একটি বেছে নেওয়ার চেষ্টা করেন, তখন আপনার উপর এক ধরনের অদৃশ্য চাপ তৈরি হয়। আপনি চান না যে আপনার সিদ্ধান্ত ভুল প্রমাণিত হোক। এই চাপের কারণে আপনি প্রতিটি বিকল্পকে অতিরিক্ত যাচাই করতে শুরু করেন, যা প্রক্রিয়াটিকে আরও জটিল করে তোলে। যেমন, জীবনসঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে এই চাপ আরও বেশি অনুভূত হয়, কারণ এটি জীবনের একটি বড় সিদ্ধান্ত।
সপ্তমত, প্রোফাইল তৈরির প্রবণতা (Curated Selves)। অনলাইন প্রোফাইলগুলো প্রায়শই মানুষের সেরা দিকগুলো তুলে ধরে। ছবি থেকে শুরু করে বর্ণনা পর্যন্ত সবকিছুই সাজিয়ে-গুছিয়ে উপস্থাপন করা হয়। এর ফলে আমরা আসল মানুষটিকে বুঝতে পারি না এবং মনে করি যে সবাই বুঝি পারফেক্ট। যখন আমরা বাস্তবতার কাছাকাছি কোনো মানুষকে দেখি, তখন সেই অবাস্তব প্রত্যাশার কারণে হতাশা জন্ম নেয়। অনেক প্রোফাইল দেখার পর এই কৃত্রিমতার জালে আমরা আরও বেশি বিভ্রান্ত হই।
অষ্টমত, অভিজ্ঞতার অভাব (Lack of Experience in Filtering)। অনেকেই অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রোফাইল দেখার সময় কার্যকরভাবে ফিল্টার করতে জানেন না। তারা প্রথম থেকেই একটি নির্দিষ্ট ক্রাইটেরিয়া সেট না করে সমস্ত প্রোফাইল দেখতে শুরু করেন। ফলে, অপ্রয়োজনীয় প্রোফাইলগুলোও তাদের সিদ্ধান্তের উপর প্রভাব ফেলে। একটি কার্যকর ফিল্টার কৌশল এই সমস্যাকে অনেকাংশে কমাতে পারে।
নবমত, প্রাথমিক আকর্ষণের সীমাবদ্ধতা (Limitations of Initial Attraction)। অনেক সময় আমরা প্রোফাইলে থাকা ছবি বা কয়েকটি বাক্যের উপর ভিত্তি করে প্রাথমিক আকর্ষণ অনুভব করি। কিন্তু এই প্রাথমিক আকর্ষণ দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের জন্য যথেষ্ট নয়। যখন আমরা অনেক প্রোফাইল দেখি, তখন এই প্রাথমিক আকর্ষণের উপর ভিত্তি করে বারবার সিদ্ধান্ত নিতে যাই, যা শেষ পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদী সাফল্যের মুখ দেখে না।
দশমত, সিদ্ধান্তের পর অনুশোচনা (Post-Decision Regret)। যদি আপনি অনেক প্রোফাইল দেখার পর একটি সিদ্ধান্ত নেন, তবুও আপনার মনে একটি সংশয় থেকে যেতে পারে যে, “যদি আমি অন্য প্রোফাইলটি বেছে নিতাম, তাহলে কি আরও ভালো হতো?” এই ধরনের অনুশোচনা আপনাকে বর্তমান সিদ্ধান্তের উপর আত্মবিশ্বাসী হতে দেয় না। এই অনুশোচনা, বিশেষ করে যখন আপনার কাছে আরও বিকল্প রয়েছে, তখন আরও তীব্র হয়।
এই সমস্যার সমাধান কী?
এই সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে কিছু কৌশল অবলম্বন করা যেতে পারে:
- বিকল্পের সংখ্যা সীমিত করা: শুরুতেই আপনার পছন্দের কিছু নির্দিষ্ট মানদণ্ড স্থির করুন এবং শুধুমাত্র সেই মানদণ্ড পূরণকারী প্রোফাইলগুলো দেখুন।
- নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য স্থির করা: আপনি প্রোফাইলটি কেন দেখছেন, তার একটি স্পষ্ট উদ্দেশ্য থাকা উচিত। এটি কি কেবল তথ্য সংগ্রহ? নাকি একটি সম্পর্ক শুরু করা?
- “সন্তুষ্ট” হওয়ার মানসিকতা: “পারফেক্ট” খোঁজার পরিবর্তে “পর্যাপ্ত ভালো” (Good Enough) খুঁজে বের করার মানসিকতা গ্রহণ করুন। মনে রাখবেন, কোনো মানুষই শতভাগ পারফেক্ট নয়।
- বিরতি নেওয়া: একটানা অনেক প্রোফাইল না দেখে মাঝে মাঝে বিরতি নিন। এতে আপনার মস্তিষ্ক তথ্য প্রক্রিয়াকরণের জন্য যথেষ্ট সময় পাবে।
- অন্তর্জ্ঞানকে গুরুত্ব দেওয়া: কখনও কখনও অতিরিক্ত বিশ্লেষণ না করে আপনার অন্তর্জ্ঞানকে বিশ্বাস করুন।
অনেক প্রোফাইল দেখার পর সিদ্ধান্তে আসা কঠিন হওয়া একটি স্বাভাবিক মানবিক প্রবণতা। তথ্য আধিক্য, তুলনার ক্লান্তি, FOMO এবং অবাস্তব প্রত্যাশার মতো কারণগুলো এই সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তোলে। এই চ্যালেঞ্জগুলো সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং কার্যকর কৌশল অবলম্বন করা আমাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে সহজ করতে সাহায্য করতে পারে।
আপনার কি মনে হয় এই সমস্যাটি শুধু ব্যক্তিগত সম্পর্ক খোঁজার ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ, নাকি পেশাগত জীবনেও এটি প্রভাব ফেলে?